ফোরক্বান মিডিয়া
ফোরক্বান মিডিয়া

এক নজরে হযরত উমর ফারুক রাঃ চমত্‍কার স্মরনীয় কিছু ঘটনা যা পড়লে চোখে পানি চলে আসবে

  • পোস্টটি প্রকাশিত হয়েছে - 2 October, 2018, Tuesday
  • 2890 বার দেখা হয়েছে
  • হযরত উমর ফারুক রাঃ) চমত্‍কার কিছু স্মরণীয় ঘটনাঃ

    (আল ফারুক) উপাধির ইতিহাস:

    হযরত ওমর (রাঃ) ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেই রাসূল (সঃ) কে জিজ্ঞাসা করলেন, ”হে আল্লাহর রাসূল (সঃ) বর্তমানে মুসলমানের সংখ্যা কত?
    রাসূল (সঃ) উত্তর দিলেন, ”তোমাকে নিয়ে ৪০ (চল্লিশ) জন।”
    হযরত ওমর (রাঃ) বললেন, ”এটাই যথেষ্ট। আজ থেকে আমরা এই চল্লিশ জন্যই কাবা গৃহে গিয়ে প্রকাশ্যে মহান আল্লাহ তায়ালার ইবাদাত করবো। ভরসা মহান আল্লাহর। অসত্যের ভয়ে আর সত্যকে চাপা পড়ে থাকতে দেব না।”

    রাসূল (সঃ) হযরত ওমরের (রাঃ) এই সদিচ্ছার উপর খুশি মনে অনুমতি দিলেন। হযরত ওমর (রাঃ) সবাইকে নিয়ে তরবারি হাতে ‘আল্লাহু আকবার’ ধ্বনি দিতে দিতে কাবা প্রাঙ্গণে গিয়ে উপস্থিত হলেন। মুসলিম দলের সাথে হযরত ওমর (রাঃ) কে এভাবে কাবা প্রাঙ্গণে দেখে উপস্থিত কাফের কুরাইশগণ যার পর নাই বিস্মিত ও মনোক্ষুণ্ন হয়ে পড়লেন।

    তাদের মনোভাব দেখে হযরত ওমর (রাঃ) বজ্রকণ্ঠে গর্জন করে বললেন, ”আমি তোমাদের সাবধান করে দিচ্ছি, কোন মুসলমানের কেশাগ্র স্পর্শ করলে ওমরের তরবারি তোমাদের বিরুদ্ধে উত্তোলিত হবে।”

    কাবায় উপস্থিত একজন কুরাইশ সাহস করে বললেন, ”হে খাত্তাব পুত্র ওমর! তুমি কি সত্যিই মুসলমানহয়ে গেলে?
    আরবরা তো কখনো প্রতিজ্ঞাচ্যুত হয় না। জানতে পারি কি, তুমি কোন জিনিস পেয়ে এমনভাবে প্রতিজ্ঞাচ্যুত হলে?

    হযরত ওমর (রাঃ) উচ্চকণ্ঠে জবাব দিলেন, ”মানুষ যার চেয়ে বেশি পাওয়ার কল্পনা করতে পারে না, আমি আজ তেমন জিনিস পেয়ে প্রতিজ্ঞাচ্যুত হয়েছি। সেই জিনিসটি হল আল কুরআন।” হযরত ওমর (রাঃ) এর এরূপ তেজোদীপ্ত কথা শুনে আর কেউ-ই কোন কথা বলতে সাহস পেল না। বিমর্ষ চিত্তে কাফের কুরাইশগণ সবাই সেখান (কাবা প্রাঙ্গণ) থেকে চলে গেল। অতঃপর রাসূল (সঃ) সবাইকে নিয়ে কাবা ঘরে নামায আদায় করলেন।

    সেখানে মুসলমানদের এটাই প্রথম নামায। এর আগে মুসলমানরা অতি গোপনে ধর্ম কর্ম পালন করতেন। পোশাক- পরিচ্ছদের পার্থক্যও রক্ষা করতে পারতেন না। এজন্য কে মুসলমান, কে পৌত্তলিক তা চেনার উপায় ছিল না। এ ঘটনার পর মুসলমানরা পোশাক- পরিচ্ছদ ও ধর্ম কর্মে পৃথক জাতিরূপে পরিগণিত হলেন। এই ঐতিহাসিক পরিবর্তন উপলক্ষে রাসূল (সঃ) হযরত ওমর (রাঃ)কে ‘আল ফারুক’ বা সত্য মিথ্যার পার্থক্যকারী উপাধিতে ভূষিত করলেন।

    [শাসন ব্যবস্থা]

    দুই বছর তিন মাস সুচারুভাবে খিলাফতকার্য সম্পাদন করে হজরত আবু বকর (রা.) ইন্তেকাল করলে হজরত ওমর ফারুক (রা.) ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা নির্বাচিত হন। খেলাফত লাভ করে তিনি রাজ্য বিস্তার এবং সাম্যবাদী চিন্তা-চেতনায় এবং গরিব সাধারণ মানুষের দারিদ্র্য বিমোচনে ইসলামের আলোকে আত্মনিয়োগ করেন।
    আজনাদীন যুদ্ধ, দামেস্ক, ফাহল সমর, শ্যাম ও হামস বিজয়, জাজিরা, খুজিস্তান, হামদান, স্পেহান, কেরমান, চিন্তাম, মাকান, খোরাসান, মিসর, ইয়ারমুক যুদ্ধ, বায়তুল মোকাদ্দাস, ইরাক ও কাদেসিয়ার মহাসমর তাঁর যুদ্ধ জয়ের উল্লেখযোগ্য ঘটনা এবং কাদিসিয়ার যুদ্ধের বিজয় সংবাদ নিয়ে যে সংবাদবাহক উটে আরোহণ করে মদিনায় এসেছিলেন, অর্ধ পৃথিবীর মহান খলিফা হয়েও তিনি উটে আরোহণ করেননি বরং উটের রশি ধরে হেঁটে হেঁটে উটচালককে সাহায্য করেছিলেন। হজরত ওমর ফারুক (রা.)-এর এই সহমর্মিতা, সহানুভূতি, বদান্যতা প্রজারঞ্জনের ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছে।

    হজরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.)-এর খিলাফতকাল পর্যন্ত মূলত কোনো রাজ্য প্রতিষ্ঠা হয়নি। প্রকৃতপক্ষে হজরত ওমর ফারুক (রা.)-ই প্রথম মুসলিম সাম্রাজ্য স্থাপন করে ইসলামের অনুশাসন বাস্তবায়নে পদক্ষেপ নেন। হজরত ওমর ফারুক (রা.) নিজের সম্পর্কে বলেছিলেন, আমি রাজা নই, আমি আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালার দাস, তোমাদের সেবক, প্রজাপুঞ্জের সমবেত পরামর্শ ব্যতীত খিলাফত চলতে পারে না। তাই তিনি বিশাল সাম্রাজ্যের শাসনপ্রণালী সুষ্ঠুভাবে সম্পাদন করতে কার্যনির্বাহ সভা বা মজলিসে শুরা গঠন করেন।

    এ সভায় হজরত উসমান (রা.), হজরত আলী (রা.), হজরত আবদুর রহমান বিন্ আওফ (রা.), হজরত মায়াজ বিন জাবাল (রা.), হজরত উবাই ইবনে কাব (রা.) সদস্য ছিলেন। দৈনন্দিন যেকোনো ব্যাপারে এ সভা ডাকা হতো এবং অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য সাধারণ সভায় বিশেষ অধিবেশনও বসত। প্রজাকুলের অধিকার, সাম্রাজ্যের বিভক্তিকরণ, উপযুক্ত শাসক নিয়োগ, সেনাবাহিনী গঠন এবং রাজকর আদায়ের যে সুষ্ঠু নীতি তিনি গ্রহণ করেছিলেন, তা অদ্যাবধি ইসলামের ইতিহাসে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে আছে।

    আইন ও বিচার ক্ষেত্রে হজরত ওমর (রা.)-এর দক্ষতা ইসলামে সাম্যতা ও ন্যায়পরায়ণতা এনেছে। তিনি ইসলামের মহান কল্যাণে দাসপ্রথা উঠিয়ে দেন এবং প্রজাকুলের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা সংরক্ষিত করেন। জিম্মির অধিকার, জান-মাল, ধর্ম ও বর্ণশাস্ত্র নিরাপদ রাখার ঘোষণাও তিনি করেন। প্রজাকুলের ব্যক্তিগত সব ক্ষেত্রে চলমান জীবন সুন্দরতম পরিচালনায় হজরত ওমর ফারুক (রা.)-এর অবদান অবিস্মরণীয় এবং ইসলামের সুবহে সাদিকের লগ্নে তাঁর উদারনৈতিক চিন্তা-চেতনা, দূরদর্শিতা বিশ্ববাসীর কাছে পাথেয় হয়ে থাকবে।

    হজরত ওমর ফারুক (রা.)-এর জীবনযাত্রা নির্বাহের প্রধান অবলম্বন ছিল মাসিক মাত্র ১৩০ টাকার সরকারি ভাতা। তিনি ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা সামান্য আহার গ্রহণ করতেন। এগুলো মোটা আটার রুটি, গোশত ও জয়তুন ছাড়া আর কিছুই নয়। অর্থাৎ পৃথিবীর মহান খলিফা হয়েও তিনি খেজুর পাতার মসজিদ ঘরে বসে বিশাল সাম্রাজ্য পরিচালনা করেছেন এবং প্রহরীবিহীন সাদামাটা ঘরে দিনযাপন করতেন।

    হজরত ওমর (রা.) ছিলেন ইসলামের সরলতা, সততা, সহনশীলতা, ত্যাগ, নিষ্ঠা, দয়া-দাক্ষিণ্য, সাহস ও বিক্রম, আমল-আখলাক এবং বিচার ও বিচক্ষণতার মূর্তপ্রতীক। মানাবিক আল-আশারায় উল্লেখ আছে, হজরত রাসুলে কারিম (সা.) বলেছেন, আমার পরে কেউ নবী হলে ওমর নবী হতো, সুবহানাল্লাহ! কত বড় মর্যাদা-সম্মানের আসনে তিনি। মূলত ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠা, গরিব সাধারণ জনগোষ্ঠীর দুঃখ-দুর্দশা মোচনে এবং সাম্যবাদী মন-মননে বাস্তব কর্মকাণ্ড পরিচালনা করাই ছিল হজরত ওমর (রা.)-এর আদর্শ, লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য।

    [হযরত উমর ফারুক রাঃ বিখ্যাত উক্তি ]

    তোমাদের শাসক হিসেবে আমি হলাম সে ব্যক্তির মত, যেমন কিছু লোক একত্রে সফর করার সময় টাকা-পয়সাগুলো একজনের হাতে জমা দিয়ে বলে যে- তোমাকে আমাদের প্রয়োজনাদি মেটানোর দায়িত্ব দেওয়া হলো। দায়িত্বপ্রাপ্ত সে ব্যক্তির কি খরচের ব্যাপারে তারতম্য করার সু্যোগ আছে? তেমনি খিলাফতের দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রেও কারও প্রতি তারতম্য করার অধিকার আমার নেই।

    আল্লাহর শপথ করে বলছি- আমি বাদশাহ নই যে, জনগনকে গোলাম বানিয়ে রাখব। আমি আল্লাহর একজন বান্দা মাত্র। আমাকে শাসনকার্য পরিচালনার দায়িত্বভার অর্পণ করা হয়েছে। এটি একটি আমানত, আমার দায়িত্ব হল জনগনের সুখ-শান্তি ও নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করা । যদি এ দায়িত্ব ঠিকমত পালন করতে পারি, তবেই আমার কৃতকার্যতা। আর যদি আমি শাসন কর্তৃত্বকে নিজের ইচ্ছাধীন করে নিই এবং জনগনকে তাদের প্রয়োজনের জন্য আমার পেছনে হাঁটাহাঁটি করতে বাধ্য করি, তবে আমার ফলশ্রুতি হবে জঘণ্য।

    দূরবর্তী নদীতীরে চর্মরোগগ্রস্ত একটি ছাগী যদি মালিশ করার মত একটু তেলের অভাবে কষ্ট পায়, তবে হাশরের দিন সে সম্পর্কেও রাষ্ট্রপ্রধানকে আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে।

    কোন ব্যক্তি যদি ঋণ পরিশোধ করতে অপারগ হয়ে পড়ে, তবে সে ঋণ পরিশোধ করার দায়িত্ব সরকারী কোষাগারকে বহন করতে হবে।

    বাকিতে ক্রয় করে যে পোষ্যপালন করেছে, সে ব্যক্তি যদি ধনবান ও অপরাধী না হয়ে থাকে, তবে তার সে ধার সরকারী কোষাগার থেকে পরিশোধ করে দাও।

    কারও কোন প্রয়োজন থাকলে আমার কাছে এসো। আল্লাহ আমাকে তোমাদের সকলের কোষাগারের রক্ষক ও বণ্টনকারী বানিয়েছেন।

    রাষ্ট্রের কোষাগারে যা আছে, তা জনগনের আমানত এবং তাদের কল্যানের জন্যই সঞ্চিত। যে পর্যন্ত জনগণের প্রয়োজন পূর্ণ না হবে, সে পর্যন্ত আমাদেরকে খরচ করতে হবে। যদি কোষাগার শূন্য হয়ে যায়, তবে কষ্টের জীবন সকলে মিলে ভাগ করে নেব।

    শাসকরা যখন বিগড়ে যায় তখন জনগনও বিগড়াতে শুরু করে। সর্বাপেক্ষা ইতর সে ব্যক্তি যার প্রভাবে তার অধীনস্থদের মধ্যে অনাচার বিস্তার লাভ করে।

    যে তোমার সামনে দোষ ধরে সেই প্রকৃত বন্ধু, আর যে সামনে প্রশংসা করে সেই শত্রু ।

    যে আমার দোষ দেখে অনুগ্রহ করে তা আমাকে জানায় তাঁর প্রতি আল্লাহর করুণা অশেষ ধারায় বর্ষিত হোক।

    [ওমর (রাঃ) শাসনের কিছু ঘটনা]

    ইয়া সারিয়া! আল-জাবাল। ইয়া সারিয়া! আল জাবাল। মসজিদে নববীতে জুমার খুৎবার অবস্থায় খলিফা উমর (রা.) হঠাৎ করে এরূপ অসংলগ্ন বাক্য উচ্চারণ করায় উপস্থিত সবাই অবাক বিস্মিত। খলিফা যথারীতি তাঁর খুৎবা পাঠ করতে থাকেন। ‘ইয়া সারিয়া! আল জাবাল- খুৎবার এ অপ্রাসঙ্গিক অংশটি যুগপৎভাবে প্রতিধ্বনিত হতে থাকে। অন্যদিকে একই সময় ইরাকের দূরবর্তী স্থানে নেহাবন্দে যেখানে মুসলিম বাহিনীর সেনাপতি সারিয়া অদৃশ্য কণ্ঠে রহস্যময় বাক্যটি নিজ কানে শ্রবণ করেন। দুইটি বাক্য কোথা থেকে কে উচ্চারণ করেছেন, এ কথা ভেবে তিনি রীতিমত হতভম্ব হয়ে পড়েন।

    খুৎবার মাঝে হঠাৎ খলিফার অদ্ভুত বাক্য উচ্চারণ কেন, কারো সাহস হচ্ছে না খলিফাকে জিজ্ঞাসা করতে। খুৎবা ও নামাজ শেষে মসজিদে উপস্থিত অনেকের মধ্যে বিষয়টি গুঞ্জন করতে থাকে। হযরত ওমর (রা.) এর সাথে অন্তরঙ্গ ছিল হযরত আবদুর রহমান ইবনে আওফ (রা.) এর সাথে। খোলামেলা আলোচনা করতেন তিনি খলিফার সাথে। তিনি অসংকোচে খলিফাকে জিজ্ঞাসা করলেন, আজ আপনি খুৎবার মধ্যে অসংলগ্নভাবে ইয়া সারিয়া! আল জাবাল (দুই কিংবা তিনবার)

    উচ্চারণ করলেন- কেন? জবাবে খলিফা একটি সৈন্য বাহিনীর কথা উল্লেখ করলেন। যারা নেহাবন্দে জিহাদে লিপ্ত, এ বাহিনীর সেনাপতি সারিয়া। তিনি বলেন, আমি দেখেছি সারিয়া একটি পর্বতের পাশে লড়ছেন। অথচ, তিনি জানেন না যে, সম্মুখ এবং পেছন থেকে অগ্রসর হয়ে শত্রু বাহিনী তাকে ঘিরে ফেলার উপক্রম করেছে। এ শোচনীয় অবস্থা দেখে আমি বিচলিত হয়ে পড়ি, আমি স্থির থাকতে না পেরে আওয়াজ দিতে থাকি হে সারিয়া পর্বতের সাথে মিলে যাও। হে সারিয়া পর্বতের সাথে মিলে যাও।

    নেহাবন্দের রণক্ষেত্র থেকে বেশকিছুদিন পর কাসেদ মদীনায় আগমন করেন এবং যুদ্ধের বিবরণ দিতে থাকেন এবং পূর্ণ ঘটনা ব্যক্ত করেন। কাসেদ জানান, আমরা যখন যুদ্ধে লিপ্ত তখন হঠাৎ একটি অদৃশ্য কণ্ঠ শোনা গেল, ইয়া সারিয়া! আল জাবাল। আওয়াজটি শ্রবণ করা মাত্র আমরা পর্বতের সাথে মিলে যাই এবং আমাদের বিজয় সূচিত হয়। ইমাম জালাল উদ্দীন সুয়ূতী (রা.) তাঁর বিখ্যাত ‘তারিখুল খোলাফা’ গ্রন্থে ঘটনাটি বিভিন্নভাবে বর্ণনা করেছেন।

    একদা দুর্ভিক্ষের সময় সর্বত্র খরা কবলিত মানুষের মধ্যে পানির জন্য হাহাকার পড়ে যায়। কোথাও বৃষ্টির নামগন্ধ নেই। হযরত উমর (রা.) এর আমল। তিনি দুর্ভিক্ষ ও খরা কবলিত দেশের এ চরম সংকটময় অবস্থা দেখে পানির জন্য আল্লাহ্র দরবারে দোয়া করলেন এবং বৃষ্টি হল, মানুষের দুঃখ দুর্দশা লাঘব হতে লাগল।

    কিছুদিন পর কতিপয় আরব বেদুইন লোক বাইর থেকে আসে এবং তারা আমীরুল মোমনীনকে জানায় যে, তারা অমুক দিন অমুক জঙ্গলে ছিল। হঠাৎ আকাশে মেঘ দেখতে পায় এবং মেঘ হতে একটি আওয়াজ ভেসে আসে। এবং আমরা শুনতে পাই ইন্নাকাল গাওসু আবা হাফছিন’ অর্থাৎ হে আবু হাফছ (উমরের কুনিয়াত ডাকনাম) আপনার জন্য বৃষ্টি নামছে।

    একটি পর্বতের গর্ত হতে অগ্নি নির্গত হত এবং এ আগুন যতটুকু বিস্তার লাভ করত সব কিছু জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ধ্বংস করে দিত। বহুকাল এ আগুনের ধ্বংসলীলা চলে আসছিল এবং খলিফা উমর (রা.) এর আমলেও তা অব্যাহত ছিল। তিনি খবর পেয়ে হযরত আবু মুসা আশআরী (রা.) অথবা হযরত তামীম দারীকে নির্দেশ দিলেন সেখানে গিয়ে আগুনকে তার গর্তের ভিতরে ঢুকিয়ে দিয়ে এসো। নির্দেশ অনুযায়ী প্রেরিত সাহাবী সেখানে গমন করেন এবং আগুন তার চাদর দ্বারা হাকাতে শুরু করেন এবং কিছুক্ষণের মধ্যে আগুন গর্তের অভ্যন্তরে চলে যায় এবং আর কখনো প্রকাশ পায়নি। এটি ছিল খলিফার নির্দেশের অভূতপূর্ব ঘটনা।

    একদা এক আজমী অনারব ব্যক্তি মদীনায় আসে এবং ফারুকে আযম (রা.) এর খোঁজ খবর নিতে থাকে। কেউ বলে দেয় যে, তিনি হয়তো কোথাও জঙ্গলে শুয়ে আছেন। আগত লোকটি জঙ্গলের দিকে গিয়ে দেখতে পায় খলিফা তলোয়ারটি মস্তকের নিচে দিয়ে মাটিতে শুয়ে আছেন। সে মনে মনে ভাবতে থাকে এই লোকটির জন্য সারা দুনিয়ায় ফেতনা হচ্ছে তাকে হত্যা করাটা সহজ একথা ভেবে সে তরবারি বের করে। হঠাৎ দেখতে পায় দুটি সিংহ তার দিকে অগ্রসর হচ্ছে। আজমী চিৎকার করতে থাকে। হযরত ওমর (রা.) জাগ্রত হয়ে যান এবং আজমী পুরো ঘটনা বর্ণনা করে এবং সে সেখানেই মুসলমান হয়ে যায়।

    হযরত ওমর (রা.)-এর খেলাফত আমলে একবার ভূমিকম্প হয় এবং পুন: পুন: প্রকম্পিত হতে থাকে। হযরত ওমর (রা.) আল্লাহ্র হামদ ও সানা পাঠ করার পর জমিনে তার দোররা মারেন এবং বলেন স্থিত হয়ে যাও। আমি কি তোমার প্রতি ইনসাফ করিনি? একথা বলার সঙ্গে সঙ্গে ভূমিকম্প বন্ধ হয়ে যায়।

    হযরত উমর (রা.) এমন ব্যক্তি ছিলেন যাঁর ইচ্ছা অনুযায়ী আল্লাহ তা’য়ালা পবিত্র কুরআনের বিশটির অধিক আয়াত নাযিল করেছেন তাঁর শান মান কত ঊর্ধ্বে তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

    [জীবন সায়াহ্নে ওমর]

    আমর বিন মাইমুন রা. বলেন, যেদিন সকালে উমর রা. আহত হন, সেদিন সকালে আমি তার সাথে দাঁড়ানো ছিলাম। আমাদের দুজনের মাঝে আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস রা. ছিলেন। আর তখন ছিল ফজরের সময়। তিনি যখন নামাযের মুহূর্তে দুই কাতারের মাঝখান দিয়ে আতিক্রম করতেন, তখন তিনি মুসল্লিদের লক্ষ করে বলতেন, তোমরা কাতার সোজা করে দাঁড়াও তখন মুসল্লিগণ ঠিকভাবে কাতার সোজা করে দাঁড়াতো, এসময় তিনি লক্ষ করতেন যে কোন কাতারে খালি জায়গা আছে কিনা। যদি তিনি কাতারে খালি জায়গা দেখতে না পেতেন তখন তিনি মুসল্লিদের সামনে গিয়ে তাকবীর বলে নামায শুরু করতেন। আর তিনি অধিকাংশ সময় ফজরের নামাযের প্রথম রাকাতে সূরা “ইউসুফ” বা সূরা “নাহল” অথবা এজাতীয় অন্য কোন দীর্ঘ সূরা পড়তেন যাতে লোকজন সবাই জা’মাতে শামিল হতে পারে।

    আমর বিন মাইমুন রা. বলেন সেদিন তাকবীর দিয়ে নামায শুরু করতেই আমি শুনলাম তিনি বলে উঠলেন, আমাকে কুকুরটি খেয়ে ফেললো বা মেরে ফেললো, কারণ এসময় একটি কালো নিগ্রো কাফের উমর রা.-কে দু’ধারী তরবারি দিয়ে আঘাত করে পালাতে লাগলো এবং আশে পাশে যারই পাশ দিয়ে অতিক্রম করেছে তাকেই আঘাত করেছে। এভাবে সে একে একে তের জনকে আহত করল। এর মধ্যে আঘাতপ্রাপ্ত সাত জনই মারা গেলেন। এই মুহূর্তে একজন মুসলমান লক্ষ করল যে, হত্যাকারী লোকটি পলায়ন করছে, তখন তিনি কানটুপিওয়ালা একটি ভারী পোশাক তার দিকে ছুড়ে মারলেন। ফলে হত্যাকারী লোকটি মাটিতে পড়ে গেলো এবং সে বুঝতে পারল যে, সে ধরা পড়ে যাবে। তাই সে আত্মহত্যা করল।

    এমন অবস্থায় হযরত উমর রা. আব্দুর রহমান বিন আউফ রা. এর হাত ধরে নামাযের ইমামতির জন্য তাকে সামনে বাড়িয়ে দিলেন। তখনো আমি উমর রা. এর নিকটেই ছিলাম। ফলে আমি সব কিছুই লক্ষ করছিলাম এবং আমার আশপাশে যারা ছিল তারাও তা লক্ষ্য করলো। আর যারা মসজিদের প্রান্তে ছিল তারা কিছুই বুঝতে পারছিল না।
    তবে তারা এটুকু বুঝতে পারল যে তারা উমর রা. এর নামাযের কিরাত শুনতে পাচ্ছেনা। তাই তারা সুবহানাল্লাহ বলে তাকবীর দিতে লাগল। কিন্তু ততক্ষণে আবদুর রহমান বিন আউফ রা. সংক্ষিপ্তভাবে নামায শেষ করে দিলেন। যারা এঘটনা বুঝতে পারেনি তারা যার যার বাড়িতে চলে গেলেন। আর তাঁর কাছে ডানে বামে যারা ছিলেন তারা নামাযের পর উমর রা. এর সামনে জমায়েত হয়ে গেলেন।

    তখন উমর রা. বললেন, হে আব্দুল্লাহ ইবনে উমর, তুমি দেখোতো কে আমাকে আঘাত করলো? তাই তিনি ঐ লোকটিকে দেখে এসে বললেন, মুগিরার নিগ্রো গোলামটি আপনাকে আঘাত করেছে। একথা শুনে উমর রা. বললেন সেই দক্ষ কারিগরটি নাকি? ইবনে আব্বাস রা. বললেন হ্যাঁ, সেই লোকটিই। তখন তিনি বললেন- আল্লাহ তাকে ধ্বংস করুন, তবে শোনো আমি তোমাদেরকে তার সাথে ভালো ব্যবহার করার আদেশ দিচ্ছি। কারণ আমাকে তার সাথে ভাল ব্যবহার করার আদেশ দেয়া হয়েছে।

    এরপর তিনি বললেন, সমস্ত প্রসংশা একমাত্র আল্লাহ তাআলার জন্য। যিনি আমার মৃত্যু এমন একজন লোকের হাতে নির্ধারণ করেননি যে ব্যক্তি ইসলামের দাবীদার। কাফেরের হাতে মৃত্যু বরণ করা আল্লাহর পথে শাহাদত বরণের সমতুল্য।

    হে আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস! তবে আমার একটা জিনিসের জন্য আফসোস হয়। সেটা হলো তুমি ও তোমার পিতা মদীনায় নিগ্রো গোলামদের আধিক্য পছন্দ করতো। আর তিনি একথা বলার কারণ হল সাহাবায়ে কেরামেরও মাঝে হযরত আব্বাস রা. সবচে বেশি গোলামের অধিকারী ছিলেন। ইবনে আব্বাস রা. একথা শুনে হযরত উমর রা. কে বললেন, আমি সমস্ত গোলামকে হত্যা করে দিব। কিন্তু উমর রা. বললেন, হে ইবনে আব্বাস! তুমি ভুল বললে। কারণ তারা তোমাদের ভাষায় কথা বলে, তাছাড়া তাদের মাঝে অনেকেই রয়েছে যারা তোমাদেরমত হজ্জ আদায় করে, তোমাদের কেবলার দিকে অভিমুখী হয়ে নামায আদায় করে। তাই কিভাবে তাদেরকে হত্যা করা যেতে পারে?

    আমর ইবনে মাইমুন রা. বলেন, এসমস্ত আলাপ আলোচনার পর উমর রা. কে বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হলো। সাথে আমরাও তার বাড়িতে গেলাম। হযরত উমর রা. বাড়িতে গিয়ে বললেন আমার মনে হচ্ছে ইতিপূর্বে মুসলমানেরা এধরণের বিপদের সম্মুখিন হয়নি। কারণ তিনি গুরুতর আহত ছিলেন। যার কারণে সমস্ত মানুষ পেরেশান হয়ে পড়ল। তবে তাদের মধ্য হতে একজন বলল, আমার মনে হচ্ছে তার কোন বিপদ হবে না, তিনি সুস্থ হয়ে যাবেন। একথা শুনে অন্য একজন বলল, আমার মনে হচ্ছে আমরা তার ব্যাপারে আশঙ্কা মুক্ত নই। কিছুক্ষণ পর পান করার জন্য তার সামনে শরবত নিয়ে আসা হলো, তিনি তা পান করলেন। কিন্তু তা তার উদর থেকে বের হয়ে গেলো। আবার দুধ আনা হলো এবং তিনি তা পান করলেন তাও তার উদর থেকে বের হয়ে গেলো। ফলে লোকেরা বুঝতে পারলো তার মৃত্যু অবধারিত।

    আমর বিন মাইমুন রা. বলেন, অতপর আমরা কয়েকজন তার সাথে একান্তে মিলিত হলাম এবং কিছুক্ষণ তার সাথে কথা বললাম তারপর আরো কিছু মানুষ উপস্থিত হলো এবং তারা প্রশংসা করতে লাগল। তাদের মধ্যে একটি যুবক বলতে লাগলো, হে আমীরুল মুমিনীন! আপনি আল্লাহর পক্ষ থেকে সুসংবাদ গ্রহণ করুন। কারণ আপনিতো রাসূল সা. এর সান্নিধ্য লাভ করেছেন এবং আমার জানামতে আপনি সর্বাগ্রে ইসলাম গ্রহণকারীদের মধ্যে রয়েছেন।

    তারপর রাসূল সা. এর ইন্তেকালের পর (হযরত আবু বকর রা. এন্তেকালের পর) আপনি রাষ্ট পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছেন। এবং ইনসাফ ও ন্যায় প্রতিষ্ঠা করেছেন। তারপর আপনি মৃত্যুর সময় আল্লাহর রাস্তায় শাহাদাত বরণ করতে যাচ্ছেন। একথা শুনার পর তিনি বললেন, আমি আশা করছি জীবনে আমি যা করেছি তা আমার জন্য যথেষ্ট হবে। আল্লাহর কাছে আমি তারই কামনা করি। এ আলোচনা শেষ হওয়ার পর যুবকটি চলে যাচ্ছিল, ঠিক তখনি হযরত উমর রা. দেখলেন যে তার লুঙ্গিটি মাটি স্পর্শ করছে, তখন তিনি বললেন হে ভাতিজা! তুমি তোমার কাপড় টাখনুর উপরে পরিধান কর। কেননা তা তোমার কাপড়ের জন্য অধিক পরিচ্ছন্নতাকর এবং আল্লাহর তাকওয়া অর্জনের ক্ষেত্রে বড় সহায়ক।

    তারপর উমর রা. তার ছেলেকে বললেন, হে আব্দুল্লাহ ইবনে উমর! তুমি দেখতো আমার কাছে মানুষের কত টাকা পাওনা আছে? তখন তিনি উপস্থিত সকলকে নিয়ে হিসাব করে দেখলেন প্রায় ছিয়াশি হাজার দিরহাম। তখন উমর রা. শুনে বললেন যদি আমার সম্পদ দ্বারা তা আদায় করা সম্ভব হয় তাহলে এই সম্পদ দ্বারাই তা আদায় করে দাও। আর যদি আমার সম্পদ এর জন্য যথেষ্ট না হয়, তাহলে আদি ইবনুল খিয়ার গোত্রের নিকট যাবে, তারপর যদি তাদের মাল দ্বারাও আদায় করা সম্ভব না হয় তাহলে কোরাইশদের থেকে সহযোগিতা নিবে। উল্লেখিত ব্যক্তিরা ব্যতিত অন্যের নিকট চাইবে না। বরং পরবর্তীতে তুমি আমার পক্ষ থেকে তা আদায় করতে চেষ্টা করবে। আমি এটাই কামনা করি।

    হে আমার বৎস! এখন তুমি আয়েশা রা. এর কাছে গিয়ে বল, উমর রা. আপনার কাছে সালাম পাঠিয়েছেন। তবে তুমি আমীরুল মু’মিন বলবে না কারণ এ অবস্থায় আমি রাষ্টের দায়ীত্বের উপর বহাল থাকছিনা, কেননা আমার মৃত্যু অবধারিত। যাহোক তুমি আয়েশা রা. কে বলবে যে, উমর তার সাথীদের সাথে দাফন হওয়ার অনুমতি চাচ্ছে। এরপর তিনি আয়েশা রা. এর নিকট উপস্থিত হয়ে তাকে সালাম জানালেন এবং তিনি ভিতরে যাওয়ার অনুমতি চাইলেন

    তিনি ভিতরে প্রবেশ করে দেখলেন যে আয়েশা রা. বসে বসে কাঁদছেন। আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রা. তাকে বললেন, আমার বাবা আপনার কাছে সালাম পাঠিয়েছেন এবং এই মর্মে আবেদন করেছেন যে, তিনি তার সাথীদ্বয়ের সাথে সমাহিত হওয়ার আশা রাখছেন। একথা শুনার পর তিনি বললেন, আমি এই স্থানটি আমার জন্য নির্বাচন করে ছিলাম। কিন্তু আজ আমি তাকে আমার উপর প্রাধান্য দিলাম। তুমি নিশ্চিন্তে ফিরে যাও তার কথামত এখানেই তার সমাধি হবে।

    

    অ্যাকাউন্ট প্যানেল

    আমাকে মনে রাখুন

    আর্কাইভ

    November 2019
    S S M T W T F
    « Oct    
     1
    2345678
    9101112131415
    16171819202122
    23242526272829
    30